আসন্ন বাজেটে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমী সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ - ফিনটেক বাংলা
You are here
Home > অন্যান্য > আসন্ন বাজেটে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমী সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ

আসন্ন বাজেটে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমী সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ

আগামী অর্থবছরের (২০১৯-২০) বাজেট ঘোষণা আসন্ন | জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে আজ | প্রতি বছরের মতো এবারো বাজেট সম্পর্কিত বিবিধ বিষয় নিয়ে চলছে আলোচনা-বিশ্লেষণ| বিভিন্ন ক্ষেত্রে করের হার হ্রাস-বৃদ্ধি যার মধ্যে অন্যতম মুখ্য আলোচনার বিষয় |

শিক্ষাখাত সবসময়ই একটি বৃহৎ আলোচনার বিষয় | অর্থবহ শিক্ষা জাতি গঠনের মূল নিয়ামক | বিগত কয়েক দশকে দেশে সাক্ষরতার হার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের সংখ্যা ব্যাপক হরে বৃদ্ধি পেলেও সার্বিক শিক্ষার মান ও প্রক্রিয়া অনেকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ | ক্রমাগত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে জিডিপি ও বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষার জন্য বরাদ্দকৃত অংশে খুব একটা তারতম্য হচ্ছেনা |

এরপরেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের দ্বারা অতি স্বল্পমূল্যে উচ্চশিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান অনন্য | প্রতিবছর এ জন্য সরকার বিপুলহারে ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে | বিভিন্ন সময় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান সরকারকে এ ভর্তুকি হ্রাসের প্রস্তাবনা দিলেও এখন পর্যন্ত সকল সরকার এ ক্ষেত্রে খুব বেশি পরিবর্তন করেনি, যা প্রশংসনীয় |পাশাপাশি এও সত্য, বৈশ্বিক মানের গবেষণার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত থাকার কারণে বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের তালিকায় বাংলাদেশের নাম খুঁজে পাওয়া দুরূহ |

যদিও এদেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মেধা ও সক্ষমতা পুরোপুরি পরীক্ষিত, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের বিবিধ সফলতার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত তার প্রতিফলন ঘটেছে |সাম্প্রতিক সময়ে দেশেই ঘটেছে কিছু অনন্য উদ্ভাবন | যেমন, ক্যান্সার সনাক্তকরণ প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক। তাদের এই আবিষ্কারের ফলে এখন রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করে মাত্র পাঁচ মিনিটেই ক্যান্সার সনাক্ত করা যাবে। হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের সর্বাধিক কার্যকর ওষুধ আবিষ্কার ও ৯০ ভাগ অকার্যকর লিভার চিকিৎসায় যুগান্তকারী সাফল্য পেয়েছেন বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা। ‘স্টেম সেল থেরাপি’ নামে এ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক |

এ ধরণের সাফল্য হয়তো আরো আসতে পারে যদি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ গবেষণার জন্য অধিকতর উৎসাহ ও সাহায্য পায় |এই সাহায্য হতে পারে বহুমাত্রিক , যেমন: আর্থিক, অবকাঠামোগত, নীতিগত; এবং তা আসতে পারে সরকারি-বেসরকারি সব ক্ষেত্র হতেই | এখানেই চলে আসে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমী সহযোগিতার (industry-academia collaboration) বিষয়টি |বিশ্বের অনেক স্থানে, বিশেষত উন্নত দেশসমূহে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের গবেষণা কর্মকান্ডে বড় একটি সাহায্য আসে সংশ্লিষ্ট খাতের শিল্প-ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসমূহের কাছ হতে | বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে নিত্য-নতুন গবেষণার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত যে উদ্ভাবন হয়, তার ব্যবহারিক প্রয়োগ অনেকাংশে করে থাকে সংশ্লিষ্ট খাতের শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহ | অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা বা উন্নত করার লক্ষ্যে নতুন পণ্য-প্রযুক্তি উদ্ভাবন-উন্নয়নের ক্রমাগত ধারায় এই প্রতিষ্ঠানসমূহের গবেষণা সহযোগীর ভূমিকা পালন করে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ | ফলে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের অবকাঠামো , গবেষণা, মানবসম্পদ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিল্প বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসমূহের বিনিয়োগের পরিমাণ ব্যাপক |

দুৰ্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশে এই ধারার প্রচলন এখনো অত্যন্ত সীমিত | এ কথা অনস্বীকার্য যে বেশিরভাগ খাতেই (বিশেষত প্রযুক্তিগত) আমরা নিজেদের তৈরী পণ্যের চেয়ে আমদানিকৃত পণ্যের উপর অনেক বেশিগুন নির্ভরশীল | এমন পরিস্থিতিতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ সবক্ষেত্রে গবেষণাকেন্দ্রিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সাহায্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনা | কিন্তু দ্রুত পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে; যেখানে বিভিন্ন মাত্রায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তির সর্বগ্রাসী প্রভাব ও দেশের ক্রমাগত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটছে; সেখানে প্রচলিত ধারা দীর্ঘ মেয়াদে সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয়না | নিজস্ব গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রয়োজন ক্ষেত্রবিশেষে সব খাতেই কমবেশি প্রয়োজন হবে | আর সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ |

বিশ্বের অনেক দেশে শিল্প-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগকে সরকারি নীতিমালার মাধ্যমে উৎসাহিত করা হয়ে থাকা (যেমন: এ ধরণের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ কর সুবিধা প্রদান) |সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে প্রাক -বাজেট আলোচনায় কর্পোরেট কর একটি মুখ্য আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে | বিভিন্ন খাতে কর্পোরেট কর হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ে যে বিতর্ক চলমান, তার একটি মধ্যবর্তী সমাধান হতে পারে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণা-উন্নয়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং সেই বিনিয়োগের উপর তাদের সম্ভাব্য কর সুবিধা প্রদান |

এর সুফল হতে পারে বহুবিধ | এরূপ বিনিয়োগের দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মকান্ড আরো বেগবান হতে পারে, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকির কিছু অংশ লাঘব হতে পারে, আবার ব্যবসায়িক-শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য কিছুটা কর সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে | বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ হতে দেখলে , এর মাধ্যমে জোরালো হতে পারে শিল্প ও শিক্ষা খাতের যৌথ পথচলা, যা খুলে দিতে পারে নিত্যনতুন জ্ঞান,গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিগন্ত | সার্বিকভাবে তা দেশের অগ্রগতিকে আরো গতিশীল করে তুলতে পারে|

সম্প্রতি প্রথম আলো তারুণ্যের জয়োৎসবে আমরা দেখলাম অসংখ্য উদ্দীপ্ত তরুনের উচ্ছল উপস্থিতি ; যারা নিজেদের উদ্যম, শিক্ষা, দক্ষতার সর্বোত্তম প্রয়োগের জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন | বিপিও সামিট ২০১৯- এ দেখা গেলো তরুণদের ব্যাপক সমাবেশ, যারা খোঁজ করছেন যথোপোযুক্ত কাজের সুযোগের |

ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমী সহযোগিতার যথাযথ প্রয়োগ এমন মেধাবী ও কর্মোদ্যমী কিছু তরুণদের জন্য ছাত্ৰাবস্থাতেই নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা আরো শানিত করার সুযোগ তৈরী করে দিতে পারে | এরূপ একটি সহায়ক নীতিমালা তৈরী ও বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের যৌথ প্রচেষ্টা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন | এর সূচনা হতে পারে নিদেনপক্ষে বাজেট আলোচনায় এই বিষয়টির অন্তর্ভুক্তি ও এর উপর সংশ্লিষ্টদলের দৃষ্টিভঙ্গি আলোকপাত  করার মাধ্যমে | তাই এই বিষয়টিতে সম্মানিত নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি বিনীতভাবে কাম্য|

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষক

মন্তব্য করুন

Top