বছরের নতুন গুঞ্জনঃ রাইড-শেয়ারিং সার্ভিস - ফিনটেক বাংলা
You are here
Home > অন্যান্য > বছরের নতুন গুঞ্জনঃ রাইড-শেয়ারিং সার্ভিস

বছরের নতুন গুঞ্জনঃ রাইড-শেয়ারিং সার্ভিস

২০১৮ সালে বাংলাদেশের বেশ আলোচিত একটি বিষয় হচ্ছে রাইড-শেয়ারিং সার্ভিস। যদিও শুরুতে এটি কেবল রাজধানী ঢাকাতে সীমাবদ্ধ ছিল তবে এখন দেশের প্রায় বিশ থেকে পঁচিশটি জেলার মানুষ এখন রাইড-শেয়ারিং সার্ভিসের সাথে পরিচিত। মূলত দেশে জনসংখ্যার বিপরীতে সেই পরিমান যানবাহন নেই। কাছের কিংবা দূরের যাত্রার জন্য জনসাধারণের যথেষ্ট ঝমেলা পোহাতে হয়। তাই রাইড-শেয়ারিং সার্ভিস অ্যাপের সাহায্যে যাত্রীরা ঘরে বসেই সুলভ মূল্যে নিজেদের গন্তব্য নির্ধারণ করে কম সময়ে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছে বলে দিন দিন এই সেবার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েই চলছে।

ইদানীং রাইড-শেয়ারিং সার্ভিস মানুষের কাছে নতুন ধরনের সেবা মনে হলেও এটি বাংলাদেশে ২০১৫ সাল থেকে যাত্রা শুরু করে। তবে স্থানীয় কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান এই সেবাটি চালু করলে সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তারা নিজেদের অবস্থানটি ধরে রাখতে পারেনি। শুধু তাই নয়; তখন বাংলাদেশ রোড অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) রাইড-শেয়ারিং সার্ভিসকে অবৈধ বলে ঘোষণা করলে পরবর্তী বেশকিছু সময় এই সেবাটি বন্ধ ছিল। পরে অন্যান্য কোম্পানি রাইড-শেয়ারিং সেবা চালু করলে সরকার এর বৈধতা উল্লেখ করে একটি বিল পাস করায়। সেই আদেশকে ভিত্তি করে বিআরটিএ রাইড-শেয়ারিং সেবার জন্য একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাইড-শেয়ারিং সার্ভিসকে অপারেশন লাইসেন্স দেওয়া হয়।

নগরবাসীর আগ্রহের ফলস্বরূপ ঢাকায় খুব কম সময়ের মধ্যে বেশি কিছু প্রতিষ্ঠান এই সেবা চালু করেছে। এক্ষেত্রে মেয়েরাও পিছিয়ে নেই। নারীদের সুবিধা ও স্বাচ্ছন্দ্যের কথা চিন্তা করে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান নারী চালকদের নিয়ে তাদের যাত্রা শুরু করেছে। যদিও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম তবে ইদানীং অনেকে এই সেবায় নিযুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করছে।

রাইড-শেয়ারিং সার্ভিসের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিছু নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়। যেমনঃ প্রতিটি রাইডিং কোম্পানি এবং গাড়ির মালিককে বিআরটিএ -এর তালিকাভুক্ত হতে হবে। কোম্পানিগুলো লাইসেন্সের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে পারবে এবং এক বছরের জন্য তাদের এক লাখ টাকা জমা দিতে হবে। যাত্রীদের চাহিদা ,দূরত্ব, প্রতিষ্ঠানের কাঠামোর উপর ভিত্তি করে বিআরটিএ  ভাড়া নির্ধারণ করে দিবে। রাইড-শেয়ারিং সার্ভিসেরব্যবসা করতে চাইলে উক্ত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অফিস এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক যানবাহন রাখতে হবে। উপরন্তু, ঢাকায় কমপক্ষে ১০০ টি যানবাহন, চট্টগ্রামের জন্য ৫০ এবং অন্যান্য শহরের ২০ টিরও বেশি যানবাহন থাকতে হবে। এই ব্যবসায় নিয়োজিত যেকোনো ব্যক্তি এমনকি চালকও যদি চাকরি ছেড়ে দিতে চায় তাহলে তাকে একমাস আগে নোটিশ প্রদান করতে হবে। রাইডারিংয়ের গাড়ির নাম ও নম্বর বিআরটিএ ওয়েব পোর্টালে জমা দিতে হবে যেন প্রয়োজনে যাত্রীরা অভিযোগ করতে পারে। চালকদের অবশ্যই তাদের যথাযথ কাগজপত্র সাথে রাখতে হবে। এমনই আরো কিছু আইন মেনে রাইড-শেয়ারিং সার্ভিস ব্যস্ত শহরের মানুষদের নিত্যদিন তাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রথম সারির রাইড-শেয়ারিং সার্ভিসগুলো কি কি তা একনজরে দেখে নেওয়া যাকঃ

উবারঃ

বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪৪০টি শহরে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের পর রাজধানী ঢাকার মাধ্যমে উবার বাংলাদেশে প্রথম প্রবেশ করে। বেশিরভাগ মানুষের ধারনা উবার দেশের প্রথম রাইড-শেয়ারিং সার্ভিস। এটি কেবলমাত্র একটি ভুল ধারনা। কারণ তার আগেও দুই একটি প্রতিষ্ঠান এই সেবা চালু করেছিল। কিন্তু বিভিন্ন ঘটনাক্রমে এবং বিভিন্ন শর্ত পূরনের সাপেক্ষে উবারই প্রথম অপারেশন লাইসেন্স নিতে সক্ষম হয়েছিল। উবার বর্তমানে উবারমোটো, উবারএক্স, উবারপ্রিমিউয়াম এই তিন ধরনের সেবা প্রদান করছে।  উবারমোটো মূলত মোটরবাইকের সেবা দিয়ে থাকে। অন্যদিকে, উবারএক্স এবং উবারপ্রিমিয়াম ভিন্ন মূল্যমানে পৃথক সেবা দিচ্ছে। তার মধ্যে উবারএক্স এর ভাড়া তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম।

পাঠাওঃ

পাঠাও অন্যতম প্রথম সারির রাইড-শেয়ারিং সার্ভিস। শুধুমাত্র জনপ্রিয়তার জন্য এর পরিধি অনেক বেড়ে গেছে। এটি গাড়ি ও বাইক উভয় ধরনের সেবা দিয়ে থাকে। তবে বেশিরভাগ মানুষ বাইকের সেবা নিতে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করছে। পাঠাও অ্যান্ড্রয়েডের পাশাপাশি আইওএস অ্যাপেও আবেদন করার জন্য গ্রাহকদের সুবিধা দিচ্ছে। পাঠাও ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামেও তাদের সেবা চালু করেছে। খরচ কম জন্য বেশিরভাগ লোকজন পাঠাও ব্যবহার করতে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে। একই সাথে মেয়েদের কথা মাথায় রেখে ‘পাঠাও’ নিয়ে এসেছে ‘লিলি’ । এখানে চালকও একজন নারীই। এটি বেশকিছু দিন আগে শুরু করলেও লিলি ইদানীং পুরোপুরি চালু করছে। তবে তাদের চালকের সংখ্যা কম বলে খুব বেশি গ্রাহক তারা নিজেদের আয়ত্তে এখন নিয়ে আসতে পারেনি।

চলোঃ

চলো রাইড-শেয়ারিং সার্ভিস বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছে ২০১৫ সালে। তবে তারা জনগণের মাঝে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। তবে চলো যে কেবল রাইড শেয়ার পর্যন্ত নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে তা নয়। তারা বিভিন্নও স্থানে বিমানের টিকিট এবং পার্সেল সরবরাহ করে থাকে। গ্রাহকরা আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড, বিডি ক্রেডিট কার্ড বা বিকাশ পেমেন্ট প্রক্রিয়া ব্যবহার করে অর্থ প্রদান করতে পারে। তারা ভবিষ্যতে খাবার সরবরাহ করার পরিকল্পনাও করছে। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সহ চলো রাইড-শেয়ারিং সার্ভিস ২০টি জেলায় সেবা প্রদান করছে।

বিডিক্যাবস্‌ঃ

বিডিক্যাবস্‌ বাংলাদেশের প্রথম ট্যাক্সি বা গাড়ির রাইড-শেয়ারিং সার্ভিস যেখানে মোবাইল ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনের সাহায্যে গ্রাহকরা বুকিং করতে সক্ষম হয়েছিল। এটি ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৫ সালে প্রথম চালু হয়েছিল। বিডিক্যাবস্‌ নিজেদের সেবা চালু করার জন্য বিভিন্ন লাইসেন্স প্রাপ্ত ট্যাক্সি কোম্পানির সাথে চুক্তি করে।

বাহনঃ

রাইড-শেয়ারিং প্রতিযোগিতায় উবার এবং পাঠাও এর সাথে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে বাহন। তারা তাদের সেবার জন্য বাছাইকৃত কিছু গাড়ি ও বাইক ব্যবহার করে। বাহন ইতিমধ্যে সম্ভাব্য গ্রাহক  পেতে অন্যান্য অংশীদার কোম্পানির সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। গ্রাহকদের সন্তুষ্টির জন্য বাহন বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অর্থ প্রদান করতে পারে।

ওবোনঃ

ওবোন সেবাও নারীদের জন্য চালু করা হয়েছে। এই সেবায়ও প্রতিটি চালক নারী। এই সেবা প্রতিষ্ঠানটি এখনো নতুন। গ্রাহকরা গুগল প্লে স্টোর এবং আইওএস অ্যাপ স্টোরে এই অ্যাপ পাবে। ওবোন শুধু বাইকের মাধ্যমে তাদের সেবা প্রদান করছে। এই কোম্পানির চালকের সংখ্যা এখনো কম, তবে তারা সবাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা আরও অনেক নারীদের ভালভাবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ফলে গ্রাহকরা ধরেই নিয়েছে যে এটি যথেষ্ট নিরাপদ। তুলনামূলকভাবে তারা সাশ্রয়ী মূল্যে রাইড শেয়ার দিচ্ছে। তাই খুব কম সময়ে তারা গ্রাহকদের উপর দারুণ প্রভাব ফেলেছে। ইতোমধ্যে তারা চট্টগ্রামেও তাদের সেবা চালু করেছে।

এমনই আরো অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান এই ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করছে। রাইড-শেয়ারিং সার্ভিস ২০১৮ সালে যাতায়াতের একটি নতুন প্রচলন তৈরি করেছে যা ব্যস্ত শহরগুলোকে আরো ক্রিয়াশীল করে তুলছে। সেই সাথে গ্রাহকদের সময় সাশ্রয় হচ্ছে এবং অনেক মানুষ খুব সহজে নিজেদের জীবিকা অর্জন করতে পারছে।   

 

 

 

  • সৈয়দা তাসমিয়াহ্‌ ইসলাম

মন্তব্য করুন

Top