'ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ে পাবলিক রিলেশান এজেন্সিগুলোর আরো বেশি কাজ করা দরকার' - ফিনটেক বাংলা
You are here
Home > ইন্টারভিউ > ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ে পাবলিক রিলেশান এজেন্সিগুলোর আরো বেশি কাজ করা দরকার’

‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ে পাবলিক রিলেশান এজেন্সিগুলোর আরো বেশি কাজ করা দরকার’

ফিনটেকের সাথে মানজেনো রায়হান খানের একটি সুন্দর কথোপকথন

কনসিটো পিআর এর অন্যতম তরুণ শেয়ার হোল্ডার মানজেনো রায়হান খান প্রতিষ্ঠানটির হেড অভ অপারেশনের দায়িত্ব পালন করছেন। অত্যন্ত প্রতিভাবান এবং বৈচিত্রের উপমায় উপমিত রায়হান খান বেশ কর্মপটু একজন মানুষ। কাজের প্রতি আন্তরিকতা এবং দূরদৃষ্টি মনোভাবের কারণে তাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তিনি গ্রামীনফোনে কাজ করেছেন এবং দেশের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ইন্ডাস্ট্রিতেও তার কাজ করার অভিজ্ঞতা অতুলনীয়। তাছাড়া তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলালিংক (অরাসকম বিডি), নিউজিল্যান্ড ডেইরি, মট ম্যাকডোনাল্ড, এসিআই এবং অটোবির জন সংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করে গেছেন।

অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী রায়হান খান বিবিএ সম্পন্ন করেছেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে এবং কাজের ফাঁকে ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন আর সাথে স্বাধের ফটোগ্রাফিকে তিনি নেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

তার এই তরুণ বয়সের অভিজ্ঞতা এবং কর্মদক্ষতার কথা ফিনটেক পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

ফিনটেক: কনসিটো পিআর কবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রতিষ্ঠার পেছনের ইতিহাস সম্পর্কে বলুন।

রায়হান খান: কনসিটো পিআর এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৯০ সালের এপ্রিলে। তার আগে আমি গ্রামীনফোনে কাজ করেছি। মার্কেটিং এর মিডিয়াতে ছিলাম সেখানে। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের ইচ্ছে ছিল আমরা বদ্ধ ঘরে না থেকে নতুন কিছু করবো জগৎটাকে দেখতে দেখতে।  গ্রামীনফোন থেকে চলে আসি এবং কাজ করতে থাকি ‘টপ অভ মাইন্ডে’ প্রায় এক বছরের মত। গ্রামীনফোনে আমাদের মিডিয়া মার্কেটিংয়ের হেড ছিলেন মঈন ভাই।  মঈন ভাই আমাকে অনুপ্রাণিত করেন নতুন কিছু করার জন্য। তিনি প্রথম আমাকে বলেন কিছু একটা করতে। সেখান থেকেই আমাদের এই কর্মকান্ডের সূচনা হয়। মঈন ভাইকে সাথে নিয়ে আমরা কনসিটো পিআর এর ফাউন্ডেশনের কাজ শুরু করি।

এই কনসেপ্টটা আসলে আসে ইন্ডিয়া থেকে। ইন্ডিয়াতে একটা কোম্পানি আছে ‘জেনেসিস বারসন মার্স-টেলার’ নামে একটা কোম্পানি আছে যা গ্লোবালি টপ মোস্ট পিআর এজেন্সি গুলোর মধ্যে একটা। ৫০ বছরের মত হবে ওরা এটা শুরু করেছিল। বিশ্বের ৮০ টা দেশে ওদের উপস্থিতি এবং ১২০ টার মতো ওদের অফিস রয়েছে। ৫০ বছরের মত হবে ওরা এটা শুরু করেছিল। বিশ্বের ৮০ টা দেশে ওদের উপস্থিতি এবং ১২০ টার মতো ওদের অফিস রয়েছে। ওরাই আমাদেরকে এপ্রোচ করে নতুন একটা প্রজেক্ট নিয়ে।  ওদের একটা হ্যান্ডসেট ছিল ‘ইউটিস্টারকম (UTStarcom)’। সেটাকে নিয়ে একটা প্রজেক্ট করে এবং ওরা পিআর এজেন্সি নিয়ে ইভেন্ট করে যেখানে আমাদেরকে ওরা আওহ্বান জানায়। এফিলিয়েশন নিয়ে কাজ করতে চায় ওরা, এবং আমরা যেন এই প্রজেক্টা হাতে নেই – এটা ওদের প্রত্যাশা ছিল।

এভাবেই আমাদের যাত্রা শুরু। এবং পিআর এজেন্সিতে ‘ইম্প্যাক্ট’ সর্ব প্রথম এবং এরা পায়োনিয়ার এজেন্সি। ২ নম্বর ছিল, মাস্টার্ড পিআর।  আমরা ৩ নম্বরে শুরু করেছি। আমাদের স্ট্রাকচারটা একটু ডিফ্রেন্ট ছিল, কারণ আমাদের এপ্রোচটা একটু আলাদা ছিল। ওই সময়টাতে পিয়ার এজেন্সিগুলো সেভাবে পাবলিক রিলেশন নিয়ে কাজ শুরু করেনি কিন্তু আমরা শুরু করেছিলাম পাবলিক রিলেশান দিয়েই।  ভিন্ন সেগমেন্ট, ভিন্ন স্টোরি টেলিং – এসব নিয়েই শুরু করি মূলত।

ফিনটেক: প্রাথমিক পর্যায়ের সময়টা কেমন ছিল?

রায়হান খান: শুরুর সময়টা আসলে আমাদের খুবই স্ট্রাগল করতে হয়েছে। কেননা, পিআর এর ধারণাটা সবার কাছে সুস্পষ্ট ছিল না। তবে, ২০১৩ কিংবা ২০১৪ এর মধ্যে  মার্কেটে একটা প্রত্যাশা আসতে থাকে যে একটা ‘ওয়েভ’ আসছে, ইন্টারেষ্টিং প্রজেক্টস হচ্ছে বাংলাদেশে। এখন এই ক্ষেত্রে কে বা কারা থাকতে পারবে? অবশ্যই কাস্টমার। এবং সাংবাদিকরা এটার স্টেকহোল্ডার, আমার কর্মকর্তারা আমার স্টেকহোল্ডার, এবং যারা ইনভেস্ট আছে তারা আমার স্টেকহোল্ডার, এবং অন্যান্য অংশীদার আমার স্টেকহোল্ডার। সার্বিকভাবে, একটা কোম্পানির রেপুটেশন এই স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে ইতিবাচক রাখাটাই হচ্ছে পাবলিক রিলেশনের কাজ।

ফিনটেক: ইউকেতে বা অন্যান্য দেশে পাবলিক রিলেশানের উপর একটা সাবজেক্ট আছে ‘রেপুটেশন ম্যানেজমেন্ট’। পাবলিক রিলেশান কোম্পানি হিসেবে আপনারা বাংলাদেশে কতটুকু প্রতিষ্ঠিত করতে পারছেন?  বা ক্লাইন্ট কি বুঝতে পারছে?

রায়হান খান: সবার কথা বলবো না, তবে আমার মনে হয় এদিক দিয়ে এগিয়ে আছে হ্যান্ডসেট কোম্পানি, টেলিকমুনিকেশান্স – ওরা রেপুটেশন ম্যানেজমেন্ট ভালো বোঝে। একটা কনসালটেন্সি ফার্ম কিভাবে রেপুটেশন রক্ষা করবে সেটা এই অর্গানাইজেশগুলো বুঝে গেছে। তবে অনুশীলনটা এখনো সেভাবে শুরু হয়ে ওঠে নি। আসলে ওই অনুভতিটাই এখনো আমাদের গ্রোয়িং কোম্পানিগুলোর মধ্যে আসে নি।

আর সত্যি কথা বলতে, বাংলাদেশের মার্কেট অতটা প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়েনি। আমি সবসময় একটা উদাহরণ দেই, সেটা হলো ‘ওয়ান + ওয়ান’। মানে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো মার্কেটিং বা ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য খুব খরচ করে না। আপনি যদি আপনার কোম্পানি নিয়ে সৎ থাকেন, তাহলে আপনি এগিয়ে যেতে পারবেন। আর ‘স্পিক্ ফর ইউরসেল্ফ’ নীতি অবলম্বন করা উচিৎ। তবে, রেপুটেশন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কোম্পানিগুলো ভাবছে এবং সেভাবে কাজ করার চেষ্টা করছে।

ফিনটেক: কনসিটো পিআর যাত্রা শুরু করে ২০০৯ এ। এই ৮ বছরে আপনারা কাদের নিয়ে পিআর করেছেন ? আপনাদের প্রধান ক্লাইন্ট সম্পর্কে কিছু বলুন?

রায়হান খান: আমরা এই মুহূর্তে কাজ করছি বেশ কয়েকটা ক্লাইন্টদের সাথে। স্যামসাং এদের মধ্যে অন্যতম। স্যামসাং গত তিন বছর ধরে আমাদের সাথে আছে। বাংলালিংকের কাজ করেছি প্রায় দেড় বছরের মতো, এর আগে করেছি এয়ারটেলের সাথে আর এখন আইপিডিসির কাজ করছি, হরলিক্স ব্র্যান্ড আমরা দেখছি, রেকিট বেঙ্কাইজার বাংলাদেশের একটা প্রজেক্ট ‘পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ নিয়ে কাজ করছি। তাছাড়া ইউনাইটেড কমার্সিয়াল ব্যাংক আমাদের ক্লাইন্ট, সিঙ্গাপুর বেইজড হাসপাতাল ‘ফেরার পার্ক হসপিটাল’  এর কাজ করছি। আর বিক্রয় ডট কম ও আমাদের সাথে আছে। জি ই হেলথকেয়ার এবং জি ই এনার্জির কাজও করে থাকি। তবে আমরা কিন্তু সন্তুষ্ট এদের সাথে কাজ করে। এই প্রবৃদ্ধিটা এসেছে ২০১৬-র দিকে।

ফিনটেক: কনসিটো পিআর এর অন্যতম ডিরেক্টর হিসেবে এই কোম্পানিগুলোতে কি কি ত্রূটি আছে বলে আপনি মনে করেন?  আর যদি থেকে থাকে তাহলে ইম্প্রুভ করার ক্ষেত্রে কি পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ?

রায়হান খান: অবশ্যই ল্যাকিংস আছে। বেশ কিছু আছে। যেমন, গ্লোবালি পাবলিক রিলেশান স্থানান্তরিত হচ্ছে ডিজিটালাইজের দিকে। এবং ডিজিটাল মার্কেটিং যতটা ইম্পরট্যান্ট, পিআর এজেন্সিগুলোর ক্ষেত্রেও আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।  আপনি যদি ফেইসবুককে একটা নিউজপেইপার ধরেন, এবং সব ইউজার্স হচ্ছে সাংবাদিক। সবাই সবার মতামত সেখানে কিন্তু দিচ্ছে। সুতরাং ফেইসবুক কিন্তু অনেক বড় একটা মিডিয়া। কিন্তু পাবলিক রিলেশান এজেন্সিগুলি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ে কাজ করছে না।  এটা কিন্তু অনেক বড় একটা ল্যাকিং এবং ইন্ডাস্ট্রিগুলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিফট হওয়া দরকার। অনেক ডিজিটাল এজেন্সি হচ্ছে, কিন্তু ওরা ডিজিটাল সাইড নিয়ে কাজ কম করছে, মার্কেটিং সাইডটা কে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে রেপুটেশন ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে।

ডিজিটাল এজেন্সির ক্ষেত্রে সবাই কিন্তু ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে কাজ করে। ওরা ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করে, প্রোডাক্ট বেইজ কাজ করে থাকে। বিজ্ঞাপনগুলি পত্রিকাতেও দেয় এবং অনলাইনেও দিয়ে থাকে এবং সেভাবে বুস্ট করে থাকে। আসলে রেপুটেশন নিয়ে কাজ করা, কোম্পানির সেট নিয়ে কাজ করাটা সেভাবে হয় না। ওই জায়গায়টাতে কাজ করা দরকার বলে আমি মনে করি। আর এই শিফটিংটা গ্লোবালি হয়ে গেছে কিন্তু আমাদের দেশে এখনো আসে নি। আমরাও চেষ্টা করছি আমাদের এই ল্যাকিংস গুলো দূর করতে কিন্তু বাকি এজেন্সিগুলোরও আসা দরকার।

দ্বিতীয়ত বলা যায় যে, অধিকাংশ পিআর এজেন্সি স্ট্রেটেজি মেইনটেইন করে কাজ করে না। যেমন। যেভাবে রেপুটেশন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে এনটিডি, স্টেকহোল্ডার, স্ট্রেন্থ এনালিসিস করে ক্লাইন্টদের জন্য যেই সার্ভিসটা দেয়া দরকার, সেটা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে স্ট্রেটেজিক কনসালটেন্সি করা দরকার সব পিআর এজেন্সিগুলোর।  তাছাড়া ক্লাইন্ট ও অনেক ক্ষেত্রে বুঝতে পারে না অনেক কিছু।  যেমন সাংবাদিক, বা সরকারের সাথে একটা সুসম্পর্ক রাখা উচিৎ যেটা ক্লাইন্ট মনে করে দরকার নাই এবং ভাবে এটা পিআরের কাজ না। এই জায়গাটাতেও একটা ল্যাকিং বলা যায় আমাদের দেশের এজেন্সিগুলোর।

তৃতীয়ত  বলবো, অধিকাংশ পিআর এজেন্সিগুলো ‘মিডিয়া বায়িং’ সেক্টরে নির্ভরশীল। কনসিটো পিআরের কিন্তু কোনো মিডিয়া বায়িং নাই। অনেক এজেন্সিগুলো যেটা করে, মিডিয়া বায়িং থেকে আয় করার জন্য হুমড়ি খেয়ে পরে, যেটা পি আর এজেন্সির পন্থা নয়। স্ট্রেটেজিটা হওয়া উচিৎ আপনি ক্লাইন্টকে আপনার স্টোরি দিয়ে কনভিন্স করবেন এবং ক্লাইন্ট সেভাবেই আপনার কাছে আসবে। কেননা স্টোরি টেলিংটাই তো পিআরের আসল কাজ।  আর এই জায়গাটা নিয়ে কাজ করার আগ্রহ পায় না অনেক পিআর এজেন্সিগুলো।

চতুর্থত: আমাদের দেশে পাবলিক রিলেশান নিয়ে কোনো বিষয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে নেই। শুধুমাত্র পি আরের উপর ‘ইউল্যাব’ এ একটা কোর্স চালু আছে, আর অন্যান্য ইউনিভার্সিটিতে জার্নালিজমে পি আরের কিছু স্পর্শ আছে বলা যায় কিন্তু আলাদা কোনো সাবজেক্ট বা ডিপার্টমেন্ট নেই।  এটা একটা ল্যাকিং বলা যায়। তবে আমরা নিজেরা ট্রেইনিং দিয়ে থাকি যখন আমাদের এখানে যারা কাজ করতে আসে, বা কাজ করছে।

ফিনটেক: আপনাদের কি কোনো প্ল্যান আছে যে এরকম কোনো ইউনিভার্সিটির সাথে ইন্টার্নশীপ এর ব্যবস্থা করবেন? বা এরকম কোনো প্রোগ্রাম আপনারা হাতে নিয়েছেন কিনা?

রায়হান খান: না, এখনো করি নি তবে মাঝখানে একবার ইউল্যাবের সাথে আমাদের মিটিং হয়েছিল এই ব্যাপারে, একটা দুইটা লেকচারও আমরা দিয়েছিলাম সেখানে,  ইন্টার্নশীপ এর ব্যবস্থা করেছি। আসলে এই ব্যাপারে অন্যান্য সাবজেক্টের উপর যারা গ্র্যাজুয়েশান করেছে, তাদের জন্য পি আর এজেন্সিতে কাজ করাটা বেশ ডিফিকাল্ট হয়ে ওঠে। আসলে, আমরা চাই অভিজ্ঞ লোকবল, কিন্তু আমরা সেভাবে পাই না।

ইউনিভার্সিটিগুলো এই পদক্ষেপ গুলো যদি নেয়, আমার মনে হয় আমরা পিআর এজেন্সিগুলোকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারবো।

ফিনটেক: আমাদের সাথে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ।

রায়হান খান: ফিনটেককেও ধন্যবাদ এত সুন্দর ও আকর্ষণীয় একটা পত্রিকাতে আমার সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য। 

মন্তব্য করুন

Top