'আমার স্বপ্ন বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক একদিন প্রযুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে' - ফিনটেক বাংলা
You are here
Home > ইন্টারভিউ > ‘আমার স্বপ্ন বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক একদিন প্রযুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে’

‘আমার স্বপ্ন বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক একদিন প্রযুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে’

সোনিয়া বশির কবিরের একটি অনন্য সাক্ষাৎকার।  সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাকিব সরকার এবং মিজানুর রহমান।  

সোনিয়া বশির কবির সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। নারীদের রোল মডেল হিসেবে যদি তাকে তুলে ধরা হয়, সেটাও কম বলা হবে কেননা প্রযুক্তির এই বিশ্বে যেকোনো পেশার ক্ষেত্রে  তিনি নারী ও পুরুষ উভয়েরই রোল মডেল।

মিস কবির, বর্তমানে মাইক্রোসফট বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছাড়াও লাওস, নেপাল ও ভুটানেও একই দায়িত্ব পালন করছেন।  বলার অপেক্ষাই রাখে না, চারটি দেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিস কবির টেক ওয়ার্ল্ডে কতটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন।  আমরা যখন তার গুলশানের অফিসে গেলাম, তখন তার কর্মস্পৃহা এবং তার অসাধারণ জ্ঞান এবং চিন্তা ভাবনা আমাদের মুগ্ধ করেছে।  তিনি ফিনটেকের সাথে কথা বলেছেন মাইক্রোসফট নিয়ে, ক্লাউড কম্পিউটিং নিয়ে, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল নিয়ে এবং আরো অনেক কিছু।

তার জ্ঞানগর্ভ কথা এবং অভিজ্ঞতা ফিনটেকের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

ফিনটেক: আপনি ২০ বছরের মতো ‘সিলিকন ভ্যালি’-তে ছিলেন। সেই সময়ে নতুন নতুন প্রযুক্তি কি ছিল এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টদের সাথে কাজ করার সময়টা কেমন ছিল, সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আমাদের জানান। 

সোনিয়া বশির কবির: আমার জার্নিটা খুব ইন্টারেষ্টিং ছিল। আমি ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় বিয়ে করে ফেলি এবং সিলিকন ভ্যালিতে চলে যাই। আমি বিএসসি ডিগ্রি এবং এমবিএ সেখান থেকেই করি আর ভ্যালিতেই কাজ করতে থাকি প্রায় এক যুগ ধরে। সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হলো যখন পার্সোনাল কম্পিউটিং এর যুগ শুরু হয়। এটা ছিল ১৯৮১ সাল। আইবিএম এর পার্সোনাল কম্পিউটার আসলো। মাইক্রোসফট এর কারণে তখন ওএস সফটওয়্যার এর ‘ডস ১.০’ আমরা পেলাম। মাইক্রোপ্রসেসরের উন্নয়নের পর, পার্সোনাল কম্পিউটার অনেক কম মূল্যে পাওয়া যেতে শুরু করলো। এবং সারা বিশ্বে এই পার্সোনাল কম্পিউটার বেশ একটা সাড়া ফেলে দেয় তখন থেকেই। এভাবেই ভ্যালিতে আমার বেশ মোহময় সময় কাটতে থাকে।

আমি ডটকম বাবলের সময়টা কিন্তু দেখেছি। ডটকম বাবল একটা ঐতিহাসিক আর্থিক বাবল যেটা ৯০ দশকের পরে শুরু হয়েছিল। ইন্টারনেট ভিত্তিক কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগের কারণে ইকুইটি বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রযুক্তিভিত্তিক নাসডাকের সূচক ১০০০ এর নিচ থেকে বেড়ে ৫০০০ এসেছে।

ভিসিদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা যদি বলি, সেক্ষেত্রে আমি বলবো ব্যাপারটা বেশ  স্মরণ করার মতো। আমি এখনো তাদেরকে মূল্যবোধের মধ্যে রেখে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে চাই। তারা এক কথায়, সফলতার পথ প্রদর্শক। কর্মদক্ষতা ছাড়া দৃষ্টিভঙ্গি, অলীক অস্তিত্ব ছাড়া কিছুই নয়। ভিসিরা সিইওদের দেখা শোনা করবেন যারা স্থিতিশীল নয় বরং অধ্যবসায়ী। নির্বাহী কর্মকর্তারা ব্যর্থ হবেন না ঠিকই, কিন্তু ব্যর্থতা যদি এসেও যায়, সফলতার দিকে ধাবিত হতে এতটুকু সময় নেবেন না।

ফিনটেক: সিলিকন ভ্যালিতে আপনি ৭ বছর ধরে সান মাইক্রোসিস্টেম/ওরাকল এ কাজ করেছিলেন। সেই সময়ের উল্লেখযোগ্য কিছু স্মৃতিময় মুহূর্ত আমাদের সাথে শেয়ার করুন।

সোনিয়া বশির কবির: সান কোম্পানির মত ‘কুলেস্ট’ কোম্পানি আর নেই। আমি কিন্তু ৯০ দশকের শেষের দিকের কথা বলছি।  আমি সেখানে আমার কাজের সময়টা খুবই উপভোগ করতাম ।

স্মরণীয় শিক্ষার কথা বলতে গেলে প্রথম কথাটা আমি বলবো ‘ডিজরাপটিভ’। কারণ সান কম্পানি খুব প্রগতিশীল চিন্তা-ধারার মধ্যে দিয়ে চলতো  এবং যেকোনো ধরণের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাটা এই কম্পানির একটা প্রধান লক্ষ্যই যেন ছিল। বর্তমানের সান রে মডেল টি তখন ছিল ক্লাউড কম্পিউটিং মডেল। দ্বিতীয়ত, উদ্ভাবনশীলতার কথা বলতে হয়। এই সান মাইক্রোসিস্টেম কম্পানি কিন্তু উচ্চস্তরের প্রোগ্রমিং ভাষা ‘জাভা’ তৈরী করেছিল। ডিজাইনটি করা হয়েছিল মূলত সেট-টপ বাক্স আর হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইসগুলোর জন্য কিন্তু পরবর্তীতে সেগুলো  অ্যাপ্স  হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

ফিনটেক: আপনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন কিন্তু সর্বোপরি আপনি একজন বাংলাদেশী ছিলেন সিলিকন ভ্যালিতে। আপনি প্রযুক্তি পেশার ক্ষেত্রেও অনেক এগিয়ে আছেন। উন্নত দেশের প্রেক্ষাপটে নারী হিসেবে আপনার সুযোগ সুবিধা কি ছিল?

সোনিয়া বশির কবির: আমার দুটি সুবিধা ছিল। প্রথমত, আমি সিলিকন ভ্যালিতে শিক্ষা গ্রহণ করেছি এবং দ্বিতীয়ত আমি সঠিক মানুষদের সংস্পর্শে আসতে পেরেছিলাম । আমার এমবিএ ক্লাসে গেস্ট টিচারদের সহযোগিতা পেয়েছিলাম এবং যেই প্রফেসররা ছিলেন, তারা সবাই প্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ।  নেটওয়ার্কিংয়ের ক্ষমতাকে অবজ্ঞা করা যায় না। ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা হলো তারা সঠিক নেটওয়ার্কিংয়ের মধ্যে আসতে সক্ষম হয় নি।

ফিনটেক: আপনি সিলিকন ভ্যালিতে ২০ বছর থেকে বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন।  আমরা জানি আপনি কিভাবে কোথায় কাজ করেছেন, কিন্তু আপনার আজকের এই অবস্থানে থাকার পেছনের রহস্য জানতে চাই।

সোনিয়া বশির কবির: আমি ভ্যালিতে প্রযুক্তি, প্রক্রিয়া এবং পণ্য সম্পর্কে শিখেছি, যা আমাকে আমার কর্মজীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য  সাহায্য করেছিল। তবুও আমার শিক্ষা পরিপূর্ণ ছিলোনা যতদিন না পর্যন্ত আমি দেশে ফিরে আসতে পেরেছিলাম । গত ১০ বছরে আমি যা শিখেছি, সেটা আমি আমার প্রাত্যহিক কর্মকান্ডে কাজে লাগিয়েছি।  ‘কৃতজ্ঞতা’ এবং ‘গ্রহণ করতে পারা’র ক্ষমতা আমার জীবনে চিন্তা শক্তির পরিবর্তন এনে দিয়েছে।  আমার মনে হয় জাতি হিসেবে, আমাদের ব্রেইনের উইন্ডোজকে উন্মুক্ত করে গ্রহণ করার শক্তি অর্জন করতে হবে, এবং প্রযুক্তিকে সর্বোপরি আলিঙ্গন করতে হবে। এমনকি একজন কৃষক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন যতটা একজন রকেট বিজ্ঞানী করতে পারেন।

ফিনটেক: বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং লাওসে মাইক্রোসফটের অপারেশন সম্পর্কে কিছু বলুন যার কারণে আপনি এমডি হতে পেরেছেন।

সোনিয়া বশির কবির: মাইক্রোসফট কিন্তু একটা কোম্পানি হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, “আমরা প্রতিটি নাগরিক এবং প্রতিটি সংস্থাকেই ক্ষমতাসীন করে গড়ে তুলবো আরো বেশি কিছু অর্জন করতে। বিভিন্ন দেশের জন্য আমার লক্ষ্য হল প্রযুক্তির সুসমাচার প্রচার করা এবং তাদের শিল্প সমস্যাগুলির সমাধান করার জন্য তাদের তথ্যগুলি যাতে ডেটা প্ল্যাটফর্ম থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত বিস্তৃত করা যায়। ক্ষুদ্র বিকাশমান অর্থনীতিতে প্রযুক্তি লাভের মধ্য দিয়ে মধ্যম আয়ে গ্রাজুয়েট করার ক্ষমতা রয়েছে। আমি খুবই উদ্বেলিত যে আমি এই সমস্ত দেশগুলোকে ক্ষমতাসীন করার সুযোগ পেয়েছি।

ফিনটেক: মাইক্রোসফট বাংলাদেশকে কিভাবে উপস্থাপন করবে?

সোনিয়া বশির কবির: আমরাই একমাত্র ফরেন প্রযুক্তি কোম্পানি যেটা বাংলাদেশেরও কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত। আমরা মাইক্রোসফট বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড। আমরা সরকারকে ট্যাক্স দিয়ে থাকি এবং এটা মাইক্রোসফটের প্রতিশ্রুতি। বিআইডিএ কর্তৃক অনুমোদিত প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানী খুলতে আমরা অনেক ডলার বিনিয়োগও  করেছি। বাংলাদেশ থেকে রাজস্ব উৎপাদনের অন্যসব মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানীর হয় একটি মাত্র যোগাযোগ অফিস আছে অথবা  আইনি উপস্থিতি নেই। তারপরেও, মাইক্রোসফট কোম্পানি চেষ্টা করে চলেছে আইনি উপস্তিতির প্রতিষ্ঠা করতে।

ফিনটেক: কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে আপনি ডেল থেকে চলে এসেছেন এবং তার পরপরই ডেল ইএমসি অর্জন করে। যদি ব্যাপারটা আপনি চলে আসার আগে ঘটতো, আপনি কি অন্যভাবে বিবেচনা করতেন ?

সোনিয়া বশির কবির: খুব মজার এবং গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন করেছেন বৈকি। আসলে কি জানেন, আমি না কোনো চাকরিতেই তিন বছরের বেশি থাকতাম না, এটাই প্রথম যেখানে আমি তিন বছরের অনেক বেশি সময় ধরে আছি। আমার প্রতি মাইক্রোসফটের আচরণ অসাধারণ। আমি বিল গেইটস ফাউন্ডারস অ্যাওয়ার্ডপেয়েছি। প্রত্যেক বছর ১০ জন মানুষ বিশ্বের সারা দেশ থেকে পায় এই পুরস্কার এবং তাদের মধ্যে আমি একজন ছিলাম। আমি একটা রোলেক্স ঘড়ি পেয়েছিলাম। এসকে খোদাই করা ছিল যার মানে “এসকে উইথ থ্যাংকস বিজি” যার অর্থ বিল গেইটস। এটা আমার জীবনে খুব আনন্দের একটা ব্যাপার যেটা আমি সবসময় মনের মধ্যে লালন করে এসেছি। এই বছর আরো কয়েকটা দেশের দায়িত্ব পেয়েছি আর কাজ করে যাবো দায়িত্বশীলতার সাথে।

ফিনটেক: আচ্ছা তিন বছরের ব্যাপারটা কি? কেন তিন বছর ?

সোনিয়া বশির কবির: আমার বিশ্বাস, একই চাকরিতে একই ব্যক্তির তিন বছরের বেশি থাকা ঠিক না। প্রথম বছরে আমরা শিখি, দ্বিতীয় বছরে আমরা প্রত্যাশার আশা প্রক্ষেপন করি আর এগিয়ে চলি, এবং তৃতীয় বছরে মহান দায়িত্ব দায়িত্বের সাথে পালন করি। তারপর এটা বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। আর মাইক্রোসফট আমাকে পরিশোধন করে দিয়েছে আর বিরক্ত হওয়ার সুযোগ কেড়ে নিয়েছে।

ফিনটেক: আপনি একটা ফিনটেক কোম্পানি ‘ডি মানি’-র পরিচালক। আপনি এই ক্ষেত্রে কি ধরণের উদ্ভাবনীমূলক সম্ভাবনা দেখতে পান ? 

সোনিয়া বশির কবির: ‘ডি মানিকিন্তু একটি ওয়ালেট। ফিনটেক ডিজরাপশান গতানুগতিক ধারার ব্যাংকগুলোকে তাদের টাকা দিয়েই চলার পথ সুগম করে দিবে। মানুষকে ব্যাংকে যেতে হবে না – ব্যাংকই মানুষের কাছে আসবে ডিভাইসের মাধ্যমে। ট্র্যানজ্যাকশন তরান্নিত হবে আরো বেশি। আর আমরা এই ব্যাপারে আরো বেশি এগুচ্ছি এবং আমি বেশ এক্সসাইটেড। থাক থাক, আর কিছু না বলি, কিছু সারপ্রাইজ আপনাদের জন্য থাকুক।

ফিনটেক: আপনি এ বছর (২০১৭) ‘এসজিডি অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছেন এবং একই সাথে আপনি ইউএন টেকনোলজি ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। এ ব্যাপারে কিছু বলুন।

সোনিয়া বশির কবির: ইউএন টেক ব্যাংক শুরু হয়েছিল যখন বানকি মুন মহাসচিব ছিলেন। এটি  কম উন্নত দেশগুলির (এলডিসি) ৪৭ টি দেশের জন্য প্রতিষ্ঠিত। টেক ব্যাংক লজিস্টিক প্রযুক্তি দ্বারা মধ্যম আয়ের দেশে এলডিসিস উন্নয়ন করার লক্ষ্যে কাজ করে। আমাকে এসডিজি পাইওনিয়ার হিসেবে গ্রামীণ নারী ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি নারীদের কে ক্ষমতাসীন করতে আইটি বিজনেসের ক্ষেত্রে।

আমি আমার দেশ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের উদ্যোগ নিয়ে বেশ উৎসাহী। জাতি হিসেবে আমরা সাফল্যের প্রতি সোচ্চার। এমন একটা সময় আসবে যখন সারা বিশ্ব দেখবে প্রযুক্তির পথে বাংলাদেশের স্বপ্নময় যাত্রার বাস্তবায়ন হয়েছে। আমি আশাবাদী, সেই দিন আসবে, এবং আমার বিশ্বাস এসে গেছে।

 

 

 

                                                                                                                                                                       – মূল সাক্ষাৎকারটির অনুবাদ করেছেন অনন্য রাজ্জাক।

মন্তব্য করুন

Top