কাগজ, প্লাস্টিক, মোবাইল অথবা কোনটিই নয়? - ফিনটেক বাংলা
You are here
Home > অন্যান্য > কাগজ, প্লাস্টিক, মোবাইল অথবা কোনটিই নয়?

কাগজ, প্লাস্টিক, মোবাইল অথবা কোনটিই নয়?

১৯৪৫ সালের কোন এক রৌদ্রজ্জল সোমবার সকাল,জন বিগিন্‌স,ব্রুকলিনের নম্র স্বভাবের একজন ব্যাংকার; তিনি ফ্ল্যাটবাশ জাতীয় ব্যাংকে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন যাতে উল্লেখ ছিল এই ব্যাংক যেন তার গ্রাহকদের নগদ টাকার পরিবর্তে প্লাস্টিকের কার্ড দেওয়ার নিয়ম তৈরি করে।তিনি এই কার্ডটির নাম দিয়েছিলেন “চার্জ ইট”। এই কার্ডটি ব্যবহার করে ক্রেতারা নগদ টাকা ছাড়াই স্থানীয়ভাবে কেনাকাটা করতে পারবে এবং বিলটি বিগিন্‌সের ব্যাংকে পাঠানো হবে, যা পরবর্তীতে খুচরা বিক্রেতাদের পরিশোধ করে দিবে।তার সেই পরিকল্পনাই পরবর্তীতে বৈপ্লবিকভাবে রূপান্তরিত হয়ে ক্রেডিট কার্ড ও ডেবিট কার্ড দ্বারা অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে নতুন যুগের সূচনা করে।একসময় যা অভাবনীয় ছিল এখন তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি সাধারন ঘটনায় পরিণত হয়েছে।সেখান থেকে আমরা দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে এসেছি।

ব্যাংকের সাহায্য ছাড়া নিজেদের আর্থিক প্রয়োজনগুলো পূরণ করাদিনদিন কঠিন হয়ে পড়ছে।কিন্তু যখন প্রয়োজন হয় আমরা তখন এর সাহায্যকেই বেছে নিই।ফলে এই পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।উদাহরণস্বরূপ;কেনিয়ার “এম-পেসা (মোবাইল ফোন ভিত্তিক অর্থ স্থানান্তর, অর্থায়ন এবং মাইক্রোফিনান্সিং সার্ভিস)” ছয় বছরের মধ্যে তারা পুরোপুরি সব কাজে সক্রিয় হয়েছিল এবং এখন ১৭ মিলিয়ন গ্রাহক রয়েছে তাদের যা কেনিয়ার জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।এখন তারা সঞ্চয় এবং ক্ষুদ্রঋণের উপর মুনাফা প্রদান করে।

বাংলাদেশেও এখন মোবাইল ফোন দিয়ে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে আর্থিক সেবার নিয়ম চালু হয়েছে এবং ব্যাপকভাবে মানুষের মাঝে পৌঁছে গেছে।এই সেবার মধ্যে বিকাশ সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান এবং ২০১৫ সালের মধ্যে এটি প্রায় ১৭ মিলিয়ন মানুষের হাতে পৌঁছে গিয়েছিল।বিল গেটসও আনুষ্ঠানিকভাবে বিকাশে বিনিয়োগ করেছেন এবংমোবাইল ফোন অর্থায়ন ব্যাংকের ভবিষ্যৎ বলেঅনেকে ধারনা করছে।যারা সরাসরি ব্যাংকের গ্রাহক নয় অন্তত তারাও এই সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

কিন্তু অর্থের বিবর্তনে পরবর্তী পদক্ষেপ কি হতে পারে?ডিজিটাল মুদ্রা কি ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরিত হবে যা একটি নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি দ্বারা অবাধে প্রবাহিত হতে পারবে?ভবিষ্যতে সেবাগুলো কি বিকাশ এবং এম-পেসার মত হবে? এই পর্যন্ত মুদ্রার যাত্রা কেমন ছিল তার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেখা যাক।

টাকার বিবর্তনঃ

পূর্বে মানুষ পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে লেনদেন করত। তবে এই বিনিময় কেবল তখনই করত যখন উভয়পক্ষের স্বার্থ পূর্ণ হত। আধুনিক অর্থের প্রচলন থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সরকার এখনো পণ্যের বিনিময় করে।

প্রায় ৯ থেকে ৬ হাজার বছর আগেও মানুষ গবাদি পশুকে বিনিময়ের জন্য ব্যবহার করত যা মূলত সুইজারল্যান্ডের প্রাচীনতম মুদ্রা হিসেবে পরিচিত।তখন জনগন শুল্কের জন্য শস্য অথবা কোন উদ্ভিদ ব্যবহার করত।

পণ্য বিনিময় যখন জটিল আকার ধারন করল তখন মানুষ অন্য কোন সহজ উপায় বের করতে চাইল।অতএব,শেল টাকাপ্রায় তিন হাজার বছর আগে স্বীকৃতি পেতে শুরু করল।ঝিনুক দিয়ে তৈরি এই শেল টাকাব্যবহার হত কারন অলঙ্কার হিসেবে এগুলোর বেশ মূল্য ছিল।সমস্ত মহাদেশের বিভিন্ন সমাজে এটি প্রচলিত ছিল।

সর্বাধিক ব্যবহৃত শেল টাকা মোলাস্‌ক সাইপ্রাইয়ামোনেটা থেকে সংগৃহীত কড়ি দিয়ে তৈরি ছিল হত। তাই একে সাধারণত কড়িই বলা হত।এর উচ্চারণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে ভারত উপমহাদেশেই এর উৎপত্তি।সংস্কৃত থেকে আগত এই শব্দ সম্ভবত বিমল মিত্রের বিখ্যাত উপন্যাস “কড়ি দিয়ে কিনলাম”এর মাধ্যমে এখন বাংলায়ও প্রচলিত।কড়ি ইতিহাসে সর্বাধিক ব্যবহৃত এবং দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রা।

প্রায় ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চীনে মানুষ কড়ির আদলে প্রথম ধাতব মুদ্রার প্রচলন শুরু করে।প্রাথমিকভাবে তারা এই মুদ্রা ছুরি, তীর ইত্যাদির আকারে তৈরি করেছিল।পরে ব্যবহারের সুবিধার্থে তারা এই মুদ্রাকে গোলাকার রূপ দেয়।

পরবর্তী ৫০০ বছরের মধ্যে লিডিয়া (আধুনিককালের তুরস্ক)মুদ্রা তৈরি করে।তখন অন্যরাও এই শিল্প আয়ত্ত করে মুদ্রা তৈরি শুরু করে।কিন্তু গ্রীক, ফার্সি, রোমান সাম্রাজ্য দ্বারা উৎপাদিত মুদ্রাগুলো রুপা, ব্রোঞ্জ এবং স্বর্নের হত।চীনা মুদ্রার মত এই মুদ্রাগুলিও অনেক বেশি স্বতন্ত্র ছিল।

পরবর্তীতে চীনা জাতিই চামড়ার তৈরি টাকার মাধ্যমে কাগজের টাকা উদ্ভাবনের পরিকল্পনা শুরু করে। ১৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সাঁও ওয়েনের শাসনামলে চীনে মুদ্রার অভাব দেখা দেয়।চীনও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী সরকারগুলির মত, মুদ্রা উৎপাদন ও ব্যবহারের উপর কঠোর একচেটিয়া নজরদারি শুরু করে।কিন্তু অবশেষে স্থানীয় প্রশাসনকে মুদ্রা উতপাদন করার অনুমতি দিয়েছে। ফলে প্রচুর মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয় এবং এর মূল্য কমে যায়।এই সমস্যা সমাধানের জন্য সম্রাট এক ফুট দীর্ঘ বর্গাকার চামড়া অর্থ জারি করে যা ব্যাংক নোটের পূর্বপুরুষ ছিল।

প্রায় ৯০০ বছর পরে, ১১ শতকের দিকে,চীনে প্রথম কাগজের নোটগুলি প্রকাশিত হয়েছিল। ১৪৫৫ সনের দিকে  মুদ্রাস্ফীতির কারণে এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে ৯ম থেকে ১৫তম শতাব্দীতে কাগজের মুদ্রা চীনে ব্যবহৃত হত। প্রায় তিন শতাব্দী পরে ইউরোপ এবং সারা পৃথিবীতে কাগজ মুদ্রা ব্যবহার সাধারণ হয়ে ওঠে।

১৮১৬ সালের দিকে ইংল্যান্ডে বিশেষ কারনে ব্যবহারের জন্য স্বর্ণমুদ্রা ব্যবহার করা হত। এবং  মুদ্রাস্ফীতি রোধে ব্যাংকে কিছু নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছিল।টাকাগুলো কিছু নির্দিষ্ট পরিমানের স্বর্ণের মূল্যমানের ছিল। ১৯০০ সালের যুক্তরাষ্ট্রে “গোল্ড ষ্ট্যাণ্ডার্ড” আইন চালু হয়।

তারপর কি?

যখন মানুষ মূল্যবান সম্পদ বিনিময় শুরু করেছিল তার দশ হাজার বছর পর,অর্থের বিবর্তন অব্যাহত রয়েছে।তাহলে টাকা কিসের মাধ্যমে বিবর্তিত হচ্ছে?জ্যোতিষীরা বলেছিলেন যে ২০০০ সালের আগেই পৃথিবীতে কাগজ কমে যাবে।তারা যথোপযুক্তভাবে আশা করে যে সবকিছু স্ক্রীনে পাওয়া সহজলভ্য হবে।যাই হোক; বর্তমানে হার্ড ডিস্ক, নেটওয়ার্ক হাতের মুঠোয় তবুও কাগজের ব্যবহার অব্যাহত আছে।যদিও এটি কঠিন গণনা করা, তবুও এটা বলা সহজ যে নগদ নিজেই এর পথ তৈরি করে নেয়।তবে এটি কিভাবে নিঃশেষিত হবে তা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন।

আমরা ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে প্লাস্টিক ব্যবহার করছিএবং যারা ব্যাংকের সাথে সরাসরি জড়িত নয় সেসব জনসংখ্যার জন্য সহজ সমাধান আছে।হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইজ বিকাশের সাথে সাথে মানুষ স্মার্ট ফোনের মাধ্যমেও ডিজিটাল ওয়ালেট বহন করতে পারছে।কানাডিয়ান ব্যাংকিং শিল্প কেনিয়ার সাফল্যের কাহিনী এবং পছন্দগুলি থেকে একটি সূত্র গ্রহণ করেছে এবং ইতিমধ্যে কানাডায় মোবাইল পেমেন্ট কিভাবে কাজ করতে পারে সে ব্যাপারে স্বাধীন নির্দেশিকা গ্রহণ করেছে।

অনলাইন সেবা ও ডেভেলপাররা “সুপার অ্যাপ” এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ ডিজিটাল মুদ্রার প্রচলনের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। “উইচ্যাট” নামক একটি অ্যাপের মাধ্যমে চীনে প্রথম সুপার অ্যাপের বাস্তবায়ন ঘটে।অর্থ প্রদান সহ সমস্ত অনলাইন কার্যক্রমের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।এই ক্রস প্ল্যাটফর্ম ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং সেবাটি বিশ্বের অন্যতম বড় একটি অ্যাপ যেখানে এক বিলিয়ন একাউন্ট আছে এবং ৭০০ মিলিয়ন সক্রিয় ব্যবহারকারী আছে।ব্যবহারকারীরা এটি বিল পরিশোধ,অর্থ স্থানান্তর, বিভিন্ন সামগ্রী অর্ডার ইত্যাদি কাজের জন্য ব্যবহার করে থাকে।

সুপার অ্যাপের ঝামেলা মুক্ত ডিজিটাল কারেন্সির দিকে অগ্রসর হওয়ায় এখন আধুনিক বিশ্বের অন্যতম একটি লক্ষ্য।বড় বড় কোম্পানি ডিজিটাল ওয়ালেটে বিনিয়োগ করার মাধ্যমে কিছু সময় পর এই সেবা প্রচলিত এবং সর্বজনীন করবে;“গুগল ওয়ালেট” তাস্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।নগদ টাকার উৎপাদন খরচ, নিরাপত্তা, হিসেব রাখা ইত্যদির মত বাস্তবিক সমস্যাগুলো তখন কমে আসবে। বিভিন্নপ্রতিষ্ঠানগুলি অর্থ প্রবাহের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে রেখেছে যা ডিজিটাল কারেন্সির ক্ষেত্রে থাকবে না বলে আশা করা যায়।ডিজিটাল মুদ্রা বাস্তবায়নের জন্য এখন প্রযুক্তি বিদ্যমান যেমন বিটকয়েনের প্রকাশ।এটা শুধুমাত্র একটি সময় ব্যাপার যে আমরা নগদ টাকার জগত থেকে ডিজিটাল কারেন্সির দিকে সম্পূর্ণরূপে ধাবিত হয়ে নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছি।

মন্তব্য করুন

Top