ইট ভাটার আগুনে পুড়ছে দেশ, ব্যবহার করতে হবে পরিবেশ বান্ধব কংক্রিট ব্লক - ফিনটেক বাংলা
You are here
Home > অন্যান্য > ইট ভাটার আগুনে পুড়ছে দেশ, ব্যবহার করতে হবে পরিবেশ বান্ধব কংক্রিট ব্লক

ইট ভাটার আগুনে পুড়ছে দেশ, ব্যবহার করতে হবে পরিবেশ বান্ধব কংক্রিট ব্লক

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নগরায়ণ। আর নগরায়ণ মানেই সাড়ি সাড়ি সুউচ্চ ভবন। উন্নত দেশগুলোয় ভবন তৈরিতে পরিবেশ বান্ধব উপাদানের ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশে এখনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে গতানুগতিক ধারার নির্মাণ সামগ্রী। বিশেষ করে ভবন নির্মাণে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনিয় উপাদান ইটের ক্ষেত্রে, এখন মাটি পুড়িয়ে বানানো প্রচলিত ইটের উপরই নির্ভর করছে গোটা দেশ।

বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইন্সটিটিউট-এইচবিআরআই’র তথ্য বলছে, দেশে এখন বছরে কম করে হলেও ১৭ দশমিক ২ বিলিয়ন পিস ইট তৈরি হচ্ছে। প্রতিমিলিয়ন ইট তৈরিতে পোড়াতে হয় ২৪০ মিলিয়ন টন কয়লা। কয়লার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে বনভূমি ধ্বংস  করে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ ও বাঁশের লাকরি। ইট ভাটা গুলো থেকে বছরে কম করে হলেও ৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হচ্ছে বায়ু মন্ডলে, যা দেশের মোট কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমনের প্রায় ২৩ শতাংশ। সাথে যোগ হচ্ছে কার্বন মনোক্সাইড ও সালফার ডাইঅক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাসও। এসব বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির পাশাপাশি অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণির ও ক্ষতি হচ্ছে।

তার চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় এই ইট তৈরিতে যে মাটির প্রয়োজন তা মেটানো হচ্ছে কৃষি জমির উপরিভাগের উর্বর অংশ দিয়ে। বছরে কম করে হলেও আশি হাজার হেক্টর জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি এই ইট ভাটাগুলোতে ব্যবহৃত হয় বলে জানিয়েছে এইচবিআরআই। এতে জমি গুলো উর্বরতা হারিয়ে কৃষি কাজের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে, ঝুঁকিতে পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তা।

এমন পরিস্থিতিতে উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়াসহ পৃথিবীর অনেক উন্নয়নশীল দেশই প্রচলিত ইটের বদলে ভবন নির্মাণে বালি, সিমেন্ট ও নুরিপাথর দিয়ে বানানো ব্লক ব্যবহার করছে। এতে এক দিকে যেমন কমছে কার্বন নির্গমন অন্যদিকে রক্ষা পাচ্ছে ফসলি জমি। বাংলাদেশেও পরিবেশ বান্ধব এমন বিভিন্ন ধরণের ব্লক উদ্ভাবন করেছে এইচবিআরআই। কমপ্রেসড স্টেবিলাইজড আর্থ ব্লক, কংক্রিট হলো ব্লকসহ বিভিন্ন ধরণের ব্লক।

প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র রিসার্চ অফিসার আকতার হোসেন সরকার জানান, নদী থেকে ড্রেজিং করা বালি বা মাটির সাথে সিমেন্ট এবং খানিকটা পাথরের ছোট ছোট টুকরা ব্যবহার করে তৈরি করা হয় এসব ব্লক।  পোড়ানোর প্রয়োজন নেই। তাই এতে কার্বন নির্গমন না হওয়ার পাশাপাশি রক্ষা পাবে কৃষি জমির উর্বর মাটিও। এসব ব্লকের তাপমাত্রা ও শব্দ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রচলিত ইটের তুলনায় অনেক বেশি। ওজন কম হওয়ার পাশাপাশি নোনা ও আর্দ্রতা প্রতিরোধী হওয়ায় তুলনামূলকভাবে এ ধরণের ব্লক অনেক টেকসই বলেও জানান তিনি।

আকতার হোসেন বলেন, ভবনে প্রচলিত ইটের বদলে এসব পরিবেশ বান্ধব উপকরণ ব্যবহার করা হলে নির্মাণ ব্যায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। শুধমাত্র হলো ব্লক ব্যবহারেই এ ব্যায় কমবে কম করে হলেও ১০ শতাংশ। বাজারে প্রতিটি হলো ব্লকের দাম এখন ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, একেকটি ব্লক আকারে সাড়ে চারটি প্রচলিত ইটের সমান, যার বর্তমান বাজার মূল্য ৪০ থেকে ৫০ টাকা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ভবন নির্মাণে দেশে এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রচলিত ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রচার প্রচারণায় যথেষ্ট ঘাটতি আছে। এমনকি সরকারি উন্নয়ন কর্মকান্ডেও এখনো প্রচলিত ইটই ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে এইচিবআরআই এরই মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বৈঠকে এই ব্লকের গুরুত্ব তুলে ধরেছে, যেখানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বেশ কয়েকজন মন্ত্রীও। দেশের সমস্ত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের আর্কিটেকচারিং এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়ে বেশকিছু সেমিনার হয়েছে। প্রচলিত ইট প্রস্তুতকারি ব্যবসায়ীদের তিনটি সংগঠনের সাথেও একাধিক বৈঠক হয়েছে। সবাই ব্লক ব্যবহারের গুরুত্বের বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছেন।

তবে দেশের বেশকিছু নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে তাদের ভবনে ব্লক ব্যবহার করছেন। ২০ টির মতো বিভিন্ন ধরণের ব্লক কারখানা গড়ে উঠেছে । ব্লক ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশে এখনো সবচেয়ে এগিয়ে আছে ঐতিহ্যবাহি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কনকর্ড। ১৯৯৮ সাল থেকে ইটের বদলে পরিবেশ বান্ধব ব্লক ব্যবহার করে আসছেন তারা।

প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক সামির উদ্দিন আহমেদ বলেন, তাদের নির্মিত প্রতিটি ভবনেই এখন হলো ব্লক ব্যবহার করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত কম করে হলেও এ ধরণের ৫০০টি ভবন তৈরি করেছে কনকর্ড। কোম্পানির চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরণের ব্লক তৈরিতে আশুলিয়ায় গড়ে তোলা হয়েছে নিজস্ব কারখানা কনপ্যাক। শুরুতে ব্লকের তুলনায় ইটের দাম কম হলেও এখন পরিস্থিতি উল্টো। তাদের তৈরি প্রতিটি হলো ব্লকের দাম পড়ছে এখন ৩৫ টাকা। সম পারিমাণ ইটের তুলনায় যা ১০ থেকে ১৫ টাকা কম। পাশাপাশি এ ধরণের ব্লকের দেয়াল প্লাষ্টার করতে তুলনামূলকভাবে কম বালি সিমেন্টের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এ প্রযুক্তি সম্পর্কে মানুষের যথেষ্ট ধারণা না থাকায় এখনো পর্যন্ত বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রচলিত ইট ব্যবহার করছে বলে, মত তার।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সিনিয়র সহ সভাপতি লেয়াকত আলী ভূইঞা বলছে, কংক্রিট ব্লক ছাড়াও পরিবেশ বান্ধব ও সাশ্রয়ী আরও অনেক প্রযুক্তিই আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। তবে রিহ্যাবের বিভিন্ন মেলা ও সেমিনারে এসব প্রযুক্তির গুরুত্ব নানা ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। লেয়াকত আলী ভূইঞা বলেন, পরিবেশ বান্ধব নানা প্রযুক্তি ব্যবহার উৎসাহিত করতে স্বল্প সুদে বা নামমাত্র সূদে অর্থায়ন করা হয়। এ ধরণের নির্মাণ সামগ্রি উৎপাদন ও ব্যবহারে এমন অর্থায়নে সরকারকে এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি। তবে হুট করেই কংক্রিট ব্লক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে দেয়া ঠিক হবে না বলে মত তার। এতে আবাসন খাতে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে বলে জানান লেয়াকত আলী ভূইঞা।

এদিকে বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান বাবুল বলেন, প্রচলিত ইটের বদলে ব্লক ব্যবহারের ব্যপারে তারাও এরই মধ্যে অবগত হয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলে ব্লকের চাহিদা এখনো খুবই কম। অধিকাংশ ক্রেতাই এখনো প্রচলিত ইটই চাইছেন। এমনকি সরকারও তার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে ব্লক ব্যবহার করছে না। ফলে তারা উৎপাদনেও যেতে পারছেন না। সিমেন্ট-বালির পাশাপাশি ফ্লাই অ্যাশ ব্যবহার করেও ব্লক তৈরি করা সম্ভব। সম্প্রতি ভারতে এ ধরণের একটি প্রকল্প ঘুরে এসেছেন তারা। সেখান থেকে এ ধরণের ব্লক তৈরির একটি মেশিন বিনামূল্যে দেয়া হয়েছিল বাংলাদেশের ইট প্রস্তুতকারকদের। প্রকল্পটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করতে প্রয়োজনীয় ফ্লাই অ্যাশের জন্য পরিবেশ মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ মন্ত্রনালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু গত চারমাসেও এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত জানাতে পারেনি বিদ্যুৎ বিভাগ। ফলে বিনামূল্যে মেশিন পেয়েও শুধুমাত্র ছাইয়ের অভাবে প্রকল্পটি চালু করতে পারেছনা তারা। তবে পরিবেশ রক্ষায় প্রচলিত সব ইট ভাটাকে ধাপে ধাপে এ ধরণের ব্লক উৎপাদনে যেতে হবে এ ব্যাপারে একমত তিনি। আর এ জন্য সাবার আগে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকেই, যোগ করেন তিনি।

মন্তব্য করুন

Top